সশস্ত্র বাহিনীকে সময়োচিত স্বীকৃতি প্রধান উপদেষ্টার
অদিতি করিম
সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সরকারের সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে সমাজ মাধ্যমে চলা সব গুজব ও অপপ্রচারে পানি ঢেলে দিলেন প্রধান উপদেষ্টা। তাঁর সময়োচিত এবং স্পষ্ট বক্তব্য গোটা দেশের মানুষকে উজ্জীবিত করেছে, আশ্বস্ত করেছে।
২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টার উপস্থিতি ছিল সপ্রতিভ এবং গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এ উদ্যোগ সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সশস্ত্র বাহিনী দিবসের বিভিন্ন কর্মসূচিতে প্রধান উপদেষ্টা যেসব বক্তব্য দিয়েছেন তা মোটা দাগে তিন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে :
প্রথমত, ড. ইউনূস মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে গড়ে ওঠা সশস্ত্র বাহিনী যে আমাদের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতীক তা নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
দ্বিতীয়ত, জুলাই বিপ্লবের সময় সশস্ত্র বাহিনীর জনগণের পক্ষে সাহসী অবস্থানের প্রশংসা করেছেন।
তৃতীয়ত, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ করতে হলে যে সশস্ত্র বাহিনীকে প্রয়োজন তা নিশ্চিত করেছেন।
কিছুদিন ধরেই সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক নিয়ে নানা গুঞ্জন আকাশে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল। বিশেষ করে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানার প্রেক্ষাপটে এসব গুজব আরও পল্লবিত হয়। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে যে, এসব ব্যক্তির দায়, এর সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীকে জড়িয়ে মিথ্যাচার করা উচিত না। কিন্তু এসব কথায় কান দেয়নি ইউটিউব ব্যবসায়ীরা। এরকম পরিস্থিতিতে সব গুজবের অবসান ঘটাতে সশস্ত্র বাহিনী দিবসকে বেছে নেন প্রধান উপদেষ্টা। সশস্ত্র বাহিনী দিবস উপলক্ষে গত শুক্রবার সেনাকুঞ্জে আয়োজিত খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের উত্তরাধিকারীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেন- বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর জন্ম ১৯৭১ সালে রণক্ষেত্রে। সে সময় ২১ নভেম্বর সেনাবাহিনীর সঙ্গে নৌ ও বিমানবাহিনী সম্মিলিতভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েছিল বলে ২১ নভেম্বরকে মুক্তিযুদ্ধের একটি মাইলফলক হিসেবে গৌরবের সঙ্গে পালন করা হয়। তবে মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর সংগ্রামের সূচনা ঘটে ২৫ মার্চের রাত থেকেই। আমরা যদি বিজয় অর্জন না করতাম, তাহলে এই বীর সেনাদের মৃত্যুদণ্ড ছিল অনিবার্য, অসহনীয় হয়ে যেত তাঁদের পরিবারের সব সদস্যের জীবন।’
এই বক্তব্যের মাধ্যমে ড. ইউনূস শুধু মহান মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর অবদানের কথাই স্মরণ করেননি, বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যে মুক্তিযুদ্ধ সেটিকে স্পষ্ট করেছেন। জুলাই বিপ্লবের পর কেউ কেউ মহান স্বাধীনতা সংগ্রামকে খাটো করার চেষ্টা করছে। প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য তাদের জন্য পরিষ্কার বার্তা। মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন অনুযায়ী একটি বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনে অঙ্গীকারবদ্ধ।
জুলাই বিপ্লবে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা ছিল অসাধারণ। আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি না চালানোর ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। এর পরই সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে আসে। গত দেড় বছর, সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নানারকম বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছে একটি বিশেষ গোষ্ঠী। প্রধান উপদেষ্টা দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে একাধিক বার জুলাই বিপ্লবে সশস্ত্র বাহিনীর গৌরবময় ভূমিকার কথা স্মরণ করেছেন। বর্তমান সময়ে, জুলাই আন্দোলনে সশস্ত্র বাহিনীর অবদান নতুন করে স্মরণ করাটা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সময়ে তাদের অবদানকে কেউ কেউ অস্বীকার করতে চাইছে। এই কারণেই প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন- দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষাসহ জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় সশস্ত্র বাহিনী সব সময় জনগণের পাশে থেকে কাজ করে যাচ্ছে এবং ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও চলমান দেশ পুনর্গঠনের কাজে সশস্ত্র বাহিনী মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আস্থার প্রতিদান দিয়েছে। এটি হলো অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে একটি কার্যকর পদক্ষেপ।
জাতীয় সংসদ নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়ছে। এই নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ করতে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবস্থা, তাতে অনেকেই নির্বাচন নিয়ে শঙ্কিত। গত দেড় বছরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। পুলিশ বাহিনী এখনো পুরোপুরি সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। দেশজুড়ে চাঁদাবাজি, মব সন্ত্রাস অব্যাহত আছে। অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তৎপরতা বাড়ছে। নতুন করে অশান্ত হয়ে উঠছে আন্ডারওয়ার্ল্ড।
এরকম অবস্থায় আগামী নির্বাচন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে সেনাবাহিনীর একমাত্র ভরসা। সশস্ত্র বাহিনীর সক্রিয় অংশগ্রহণই পারে ভোটের সময় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে। গত দেড় বছরে মানুষ যেটুকু নিরাপত্তা পেয়েছে তা মূলত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণেই। তাই সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এখন সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এজন্যই প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। একটি নির্বিঘ্ন ও উৎসবমুখর নির্বাচন আয়োজনে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের দক্ষতা ও পেশাদারির সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানাচ্ছি।’
প্রধান উপদেষ্টা আরেকটি বিচক্ষণ সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। সশস্ত্র বাহিনী দিবসে ‘সেনাবাহিনী পদক’ পেয়েছেন সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। সশস্ত্র বাহিনী দিবস উপলক্ষে ঢাকা সেনানিবাসে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস সেনাপ্রধানকে এই পদক তুলে দেন। এর মাধ্যমে গুজব রটনাকারীদের চূড়ান্ত ভাবে পরাজিত করলেন প্রধান উপদেষ্টা। এসবই প্রমাণ করে, দ্রুত দেশে একটি নির্বাচনি পরিবেশ সৃষ্টি করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ড. ইউনূস। সে লক্ষ্যেই তিনি কাজ করে যাচ্ছেন।
বিডি প্রতিদিন
Leave a Reply