আত্মশুদ্ধি মুমিনজীবনের অমূল্য পাথেয়
মুফতি আবুল কাসেম নোমানি
আবু জর গিফারি (রা.) বলেন, আমার প্রিয়তম আমাকে (উপদেশ দিয়ে) বলেছেন, ‘তোমরা যেখানে থাকো আল্লাহকে ভয় কোরো, পাপ কাজ হওয়ার পর পুণ্য কোরো। কেননা পুণ্য পাপ মিটিয়ে দেয় এবং মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ কোরো।’ (সুনানে তিরমিজি)
আবু জর গিফারি (রা.) থেকে বর্ণিত এই হাদিস নবীজি (সা.)-এর জামিউল কালিমের (কথা সংক্ষিপ্ত মর্ম বিস্তৃত) অন্তর্ভুক্ত। হাদিসটি সংক্ষিপ্ত হলেও এর প্রতিফলন মুমিনের জীবনে গভীর প্রভাবক।
এখানে হাদিসের মর্ম বিশ্লেষণ করা হলো—
সর্বত্র আল্লাহকে ভয় করা
হাদিসে বলা হয়েছে, তুমি যেখানে থাকো, আল্লাহকে ভয় কোরো। যেখানেই থাকো কথাটি অত্যন্ত বিস্তৃত। অর্থাৎ তুমি একাকী থাকো বা মানুষের ভিড়ে, পরিচিত মানুষের মধ্যে থাকো বা অপরিচিতজনদের মধ্যে, মসজিদে থাকো বা ঘরে-বাজারে, ইবাদতে মগ্ন থাকো বা পার্থিব কাজে—যেখানে, যেভাবে ও যে কাজেই থাকো, সর্বদা স্মরণ রাখবে, আল্লাহ তোমাকে দেখছেন এবং তোমার ভিতর-বাহির সম্পর্কে অবগত আছেন। আমরা আমাদের বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তথা হাত, পা, চোখ, কান ও জিহ্বা দ্বারা যা কিছু করি আল্লাহ তা দেখছেন, শুনছেন এবং জানছেন।
আর আমাদের যেসব বড় গোপন পাপ আছে, যেমন—অহংকার, হিংসা, মন্দ ধারণা ইত্যাদি সম্পর্কেও আল্লাহ অবগত আছেন। যেমনটি তিনি বলেছেন, ‘চোখের অপব্যবহার ও অন্তরে যা গোপন আছে, সে সম্পর্কে তিনি অবহিত।’
(সুরা : মুমিন, আয়াত : ১৯)
সুতরাং আমাদের সব সময় খেয়াল রাখতে হবে যে আমার থেকে যেন এমন কিছু প্রকাশ না পায়, যাতে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন। হাদিসে তাকওয়া অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।
উবাই ইবনে কা‘আব (রা.) একটি সুন্দর উপমার মাধ্যমে তাকওয়ার ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, কাঁটাযুক্ত সংকীর্ণ রাস্তায় মানুষ যেভাবে শরীর ও কাপড় বাঁচিয়ে চলে, তাকওয়াও অনুরূপ একটি বিষয়। প্রবৃত্তি ও শয়তানের ধোঁকা ও প্রতারণা, মন্দ পরিবেশের প্রভাব, গুনাহর প্রতি আহবানকারী কত জিনিস আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে; এর মধ্যে নিজের আঁচল বাঁচিয়ে চলতে হবে, যেন কোথাও কোনো গুনাহ ও আল্লাহর নাফরমানি হয়ে না যায়। এমন সতর্কতা ও সচেতনতার নাম তাকওয়া।
গুনাহর প্রতিবিধানে নেকি
দ্বিতীয় উপদেশ হলো, যদি কখনো কোনো গুনাহ হয়ে যায়, সঙ্গে সঙ্গে নেক কাজ করে নেওয়া।
মানুষের আমলনামায় প্রতিটি ভালো কাজ ও প্রতিটি মন্দ কাজ লিপিবদ্ধ হয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘কেউ অণু পরিমাণ সৎ কাজ করলে সে তা দেখবে এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎ কাজ করলে সে তা-ও দেখবে।’
(সুরা : জিলজাল, আয়াত : ৭-৮)
কিয়ামতের দিন যখন বান্দার সামনে আমলনামা দেওয়া হবে তখন সে বলবে, এটা কেমন আমলনামা, এটা কেমন কিতাব! ছোট-বড় কোনো কিছুই তা লিপিবদ্ধ করতে ছাড়েনি। সবকিছুর হিসাব এখানে আছে। মানুষ তার পুরো জীবনের কাজের হিসাব নিজের সামনে উপস্থিত পাবে। সেদিন আল্লাহ কারো প্রতি অবিচার করবেন না।
এ জন্য কখনো গুনাহ হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে নেক আমল করার মাধ্যমে তা বিলোপ করতে হবে। আলেমরা বলেন, এটাও বিবেচ্য বিষয় যে কোন ধরনের নেক আমলে কোন ধরনের পাপ মিটে যায়। বিষয়টি এমন নয়, যেকোনো নেক আমলে যেকোনো পাপকাজ মিটে যায়। যেমন—কেউ নামাজ ত্যাগ করল এবং প্রত্যেক নামাজের জন্য সদকা করল, এতে তার নামাজ ত্যাগের পাপ মোচন হবে না। কারো অধিকার বিনষ্ট করেছেন এবং বিপরীতে রোজা রেখে তা মিটিয়ে ফেলতে চাচ্ছেন, এতে গুনাহ মাফ হবে না।
শরিয়ত কিছু গুনাহর প্রতিবিধান হিসেবে কিছু নেক আমল ঘোষণা করেছে। এসব গুনাহর প্রতিবিধান এভাবেই করতে হবে; যেমন—কেউ কসম ভঙ্গ করলে সে কাফফারা দেবে, ফজরের সময় চোখ খোলেনি—হাদিসের ভাষ্যানুসারে ঘুম ভাঙার সঙ্গে নামাজ আদায় করে নেবে। কিছু গুনাহ এমন, যার সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিবিধান নেই; যেমন—মুখ থেকে মিথ্যা বের হয়ে গেল; সঙ্গে সঙ্গে তাওবা করে নাও, কিছু সদকা করো এবং কোনো নেক আমল করে নাও, ক্ষমাকারী আল্লাহ অত্যন্ত দয়ালু।
মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ করা
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর তৃতীয় উপদেশ উত্তম আখলাকের ধারক হওয়া। আখলাক বা উত্তম আচরণ প্রকৃতপক্ষে হৃদয়ের অবস্থার ওপর নির্ভরশীল, যা মানুষের কাজের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। আমরা নিজেদের মধ্যে দয়া, নম্রতা, ভালো, বিনয়, অন্যকে প্রাধান্য দেওয়ার মানসিকতা তৈরি করব। এগুলো উত্তম আখলাকের অংশ। এগুলো নিজের কাজের মাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে। তা এভাবে যে বড়কে সম্মান করা, ছোটকে স্নেহ করা, দুর্বলকে সাহায্য করা, মানুষের সঙ্গে প্রশান্তির আচরণ করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, হাসিমুখে মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করাও একটি সদকা।
আমরা উত্তম চরিত্রের অধিকারী হব। কেননা কিয়ামতের উত্তম আখলাক মিজানে সবচেয়ে ভারী হবে। রাসুলে আকরাম (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন তারাই আমার নিকটবর্তী হবে, যারা উত্তম চরিত্রের অধিকারী। (মিশকাত)
উত্তম আখলাকের একটি দিক হলো মানুষ যে পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তখন নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা। সাধারণ সময় সবাই হাসিমুখে কথা বলে, ভালো মেজাজ দেখায়; কিন্তু যখন কারো সঙ্গে বাড়াবাড়ি হয়, কোনো বেআদবি হয়, অন্যায় আচরণ করা হয়, তখন দেখা যাবে তার চরিত্র আসলে কেমন।
উত্তম আখলাকের অধিকারী হতে হলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন পর্যবেক্ষণ করতে হবে, তাঁর ইতিহাস ও সিরাত পড়তে হবে। মহানবী (সা.) সম্পর্কে আয়েশা (রা.) বলেন, তিনি কখনো ব্যক্তিগত কারণে প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। অথচ শরিয়ত জুলুমের সমপরিমাণে প্রতিশোধ গ্রহণের অনুমতি দিয়েছে। প্রথম জীবন থেকে নবুয়তের পর পর্যন্ত। তায়েফের ঘটনা সবার জানা। ফেরেশতা এসে বললেন, আপনি অনুমতি দিলে এই জনপদের বাসিন্দাদেরকে দুই পাহাড়ের মধ্যে পিষে ফেলা হবে। তিনি বললেন, আমি আশা করি, তাদের সন্তানরা ঈমান গ্রহণ করবে এবং ইসলামের জন্য কাজ করবে।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে নবীজি (সা.)-এর উপদেশের ওপর আমল করার তাওফিক দিন। আমিন।
লেখক : মহাপরিচালক, দারুল উলুম দেওবন্দ, ভারত; ভাষান্তর : মো. আবদুল মজিদ মোল্লা
বিডি-প্রতিদিন
Leave a Reply