শিশুর নি রা প ত্তা য় ইসলামের শিক্ষা
আলেমা হাবিবা আক্তার
শিশুরা পেলব ফুলের মতো। তারা সমাজের সবচেয়ে কোমল ও স্পর্শকাতর অংশ। মা-বাবা, অভিভাবক, পরিবার ও সমাজের ভুল সিদ্ধান্ত ও অসচেতনতার কারণে শিশুর জীবন বিপন্ন হয়। বর্তমান বিশ্বে, বিশেষ করে আমাদের সমাজে শিশুরা হত্যা, অপহরণ, নির্যাতন ও বিভিন্ন ধরনের সহিংস অপরাধের শিকার হচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ইসলামের শিক্ষা হলো, শিশুর জীবন ও ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।
সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, দিন দিন শিশুর প্রতি মানুষের সহানুভূতি, মমতা ও স্নেহ যেন কমে যাচ্ছে। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ছোটদের স্নেহ করে না, বড়কে সম্মান করে না, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৯১৯)
ইসলামের দৃষ্টিতে মানবজীবনের মূল্য অপরিসীম। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ একজন মানুষের জীবনকে সমগ্র পৃথিবীর মানুষের জীবনের সমান ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘যে মানুষ হত্যা বা দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজ করার কারণে ছাড়া কাউকে হত্যা করল, সে যেন দুনিয়ার সব মানুষকে হত্যা করল, আর যে কারো প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন সব মানুষের প্রাণ রক্ষা করল।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৩২)
শিশুর জীবনের নিরাপত্তা যেন আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই ইসলাম জন্মের আগেই তার জীবনের নিরাপত্তা ঘোষণা করেছে। আল্লাহর নির্দেশ হলো, ‘তোমরা নিজেদের সন্তানদের দারিদ্র্যের ভয়ে হত্যা কোরো না; আমিই তাদের রিজিক দিই এবং তোমাদেরও।’
(সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৩১)
এই নির্দেশ জাহেলি যুগের কন্যাশিশু হত্যার বিরুদ্ধে অবতীর্ণ হলেও এর শিক্ষা সর্বজনীন। কোনো অবস্থায়ই সন্তানের জীবন ধ্বংস করা যাবে না। আজকের যুগে শিশু হত্যা, অপহরণ বা নির্যাতন কোরআনের এই শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
আরেকটি ভয়াবহ বিষয় হলো শিশুর ওপর যৌন নিপীড়ন। শিশুরা ঘরে ও বাইরে, আপনজন, প্রতিবেশী, শিক্ষক, পরিচিত-অপরিচিত, এমনকি ধর্মালয়ে নানা শ্রেণির মানুষের দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। তাদের অনেকের প্রাণহানিও ঘটছে। অথচ ইসলামী আইনে ধর্ষণ একটি বহুমাত্রিক অপরাধ, যার মধ্যে কমপক্ষে তিনটি অপরাধ সংঘটিত হয়-ক. ব্যভিচার, খ. বল প্রয়োগ ও ভীতি প্রদর্শন, গ. সম্ভ্রম লুণ্ঠন। ইসলামী আইনে এই তিনটি বিষয়ই পৃথকভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আর ধর্ষণে যেহেতু এই তিনটি অপরাধের সমন্বয় ঘটে, তাই ধর্ষণ একটি গুরুতর অপরাধ। আর যখন কোনো কোমলমতি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়, তা আরো বেশি গুরুতর হয়ে ওঠে।
ইসলামী আইনজ্ঞরা বলেন, ধর্ষক যদি কোনো শিশুকে ধর্ষণ করে এবং এতে শিশুর মৃত্যু হয়, তাহলে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। একইভাবে কোনো নারীকে ধর্ষণের আগে বা পরে যদি তাকে হত্যা করা হয়, তাহলে হত্যাকারী ধর্ষককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। বেশির ভাগ ফকিহর মতে, এমন ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড তরবারির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘কেউ তোমাদের সঙ্গে সীমা লঙ্ঘন করলে তোমরাও তার সঙ্গে অনুরূপ আচরণ করো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৯৪; তাফসিরে কুরতুবি : ২/৩৫৮)
শিশুর প্রতি যে সহিংস আচরণ ও নিপীড়ন হচ্ছে এ জন্য অনেক সময় পারিবারিক অবহেলা ও সামাজিক দায়বোধের অভাব দায়ী বলে প্রমাণ হয়। ইসলাম সন্তান ও শিশুর প্রতি যত্নশীল হওয়ার শিক্ষা দেয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সম্পদ ও সন্তান পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য।’ (সুরা : কাহফ, আয়াত : ৪৬)
আর প্রতিটি সৌন্দর্যের দাবি হলো তা সংরক্ষণ করা হবে এবং তা সংরক্ষণে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সুতরাং শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব।
শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি উপায় হলো তাকে ঝুঁকি ও বিপদ সম্পর্কে অবহিত করা। অনেক সময় মা-বাবা ও অভিভাবক অসৎ বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশী, আত্মীয়দের সম্পর্কে শিশুদের সচেতন করে না। তাদের মন্দ স্পর্শ ও আচরণ সম্পর্কে জানান দেয় না। এতে শিশুরা বিপদে পড়ে। কোরআন শিশুদের সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সচেতন করার শিক্ষা দিয়েছে। পিতা ইয়াকুব (আ.) পুত্র ইউসুফকে বলছেন, ‘হে আমার পুত্র! তোমার স্বপ্নের কথা তোমার ভাইদের কাছে বর্ণনা কোরো না। যদি করো তাহলে তারা তোমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করবে। শয়তান তো মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৫)
ইসলামী শিক্ষা অনুযায়ী, রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ের দায়িত্ব হলো দুর্বলদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। শিশুদের সুরক্ষার জন্য কার্যকর আইন, দ্রুত বিচার ব্যবস্থা এবং সামাজিক সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান সমাজে শিশুদের বিরুদ্ধে যে সহিংসতা ও অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা রোধে একই সঙ্গে কোরআন ও সুন্নাহভিত্তিক নৈতিকতা শিক্ষা, পারিবারিক সচেতনতা এবং রাষ্ট্রীয় কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সব শেষে মহানবী (সা.)-এর বাণী স্মরণ করতে চাই, যেখানে তিনি আদর্শ মুসলমানের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার হাত ও মুখ থেকে মানুষ নিরাপদ থাকে। আর মুমিন সেই ব্যক্তি, যার থেকে মানুষ তাদের জীবন ও সম্পদকে নিরাপদ মনে করে।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৪৯৯৫)
আল্লাহ সব শিশুকে নিরাপদ জীবন দান করুন। আমিন। সচেতনতা এবং রাষ্ট্রীয় কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সব শেষে মহানবী (সা.)-এর বাণী স্মরণ করতে চাই, যেখানে তিনি আদর্শ মুসলমানের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার হাত ও মুখ থেকে মানুষ নিরাপদ থাকে। আর মুমিন সেই ব্যক্তি, যার থেকে মানুষ তাদের জীবন ও সম্পদকে নিরাপদ মনে করে।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৪৯৯৫)
আল্লাহ সব শিশুকে নিরাপদ জীবন দান করুন। আমিন।
বিডি প্রতিদিন
Leave a Reply