চরিত্র ব্যক্তিত্বের মুকুট
শায়খ আহমাদুল্লাহ
চরিত্র মানুষের প্রকৃত পরিচয়। পৃথিবীর সব জীবের মধ্যে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো উত্তম চরিত্র। যার চরিত্র নিষ্কলুষ নয়, তিনি যত বিদ্বান, প্রভাবশালী বা ক্ষমতাবানই হোন না কেন, মানুষের কাছে তিনি নিকৃষ্ট ও নিন্দিত। আল্লাহর কাছেও তিনি অত্যন্ত অপছন্দনীয়।
মানুষকে বিপথগামী করার জন্য চারিত্রিক কেলেঙ্কারি শয়তানের বড় ফাঁদ। প্রত্যেক মুমিনের এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ সচেতন ও সতর্ক হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। আমরা এমন এক উন্মুক্ত সংস্কৃতির যুগ পার করছি, যে যুগে চারপাশ থেকে পাপের হাতছানি আমাদের গ্রাস করে আছে। এ সময় চরিত্র নিষ্কলুষ রাখা অনেকটা জ্বলন্ত কয়লা হাতে রাখার মতোই কঠিন।
আজ থেকে চৌদ্দ শ বছরেরও বেশি আগে নবী করিম (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘আমার পরে পুরুষদের জন্য নারীর চেয়ে অধিক ক্ষতিকর কোনো ফিতনা আমি রেখে যাইনি’ (সহিহ মুসলিম)। এই হাদিসের অর্থ এই নয় যে নারীরা কেবল ফিতনা বা ভয়ের কারণ; বরং এটি পুরুষদের জন্য নিজেদের চরিত্র, সংযম ও আত্মনিয়ন্ত্রণ রক্ষার একটি বিশেষ সতর্কবার্তা। শয়তান যেকোনো সময় মানুষকে নারী-সংক্রান্ত প্রলোভনের মাধ্যমে বিপথে পরিচালিত করতে পারে। আর একবার যে এই ফাঁদে পা দেবে, তার ইমান, আমল ও ব্যক্তিত্ব ধুলোয় মিশে যাবে। তাই সর্বদা আল্লাহর কাছে এই ফিতনা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা এবং সতর্ক থাকা কর্তব্য।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ সফল মুমিনদের কয়েকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন। সেখানে নামাজে একাগ্রতা, অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি বিশেষভাবে বলেছেন, আর যারা নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে তারা সফল (সুরা মুমিনুন)।
এ ক্ষেত্রে নবী করিম (সা.) আমাদের সর্বোত্তম আদর্শ। তিনি ছিলেন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ চরিত্রের অধিকারী। তাঁর চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব ছিল সব ধরনের কলুষতা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। তাই প্রকৃত মুমিন হতে হলে চরিত্রের নির্মলতা অপরিহার্য। বর্তমান সময়ে একজন মুমিনের জন্য নিজের চরিত্রের হেফাজত নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।
আমরা ইউসুফ (আ.)-এর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। চরিত্র রক্ষায় তিনি এমন এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, যা কিয়ামত পর্যন্ত যুবসমাজের জন্য আদর্শ হয়ে থাকবে। রাজপ্রাসাদের রুদ্ধদ্বার কক্ষে যখন এক ক্ষমতাবান ও রূপবতী নারী তাঁকে অবৈধ কাজে আহ্বান করেছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি’ (সুরা ইউসুফ)। প্রবল প্রলোভন ও অনুকূল পরিস্থিতি থাকা সত্ত্বেও তিনি আল্লাহভীতির কারণে নিজেকে সংযত রেখেছিলেন। আজ আমরাও যদি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাকওয়াকে সঙ্গী করতে পারি, তবে কোনো প্রলোভনই আমাদের চরিত্রকে কলুষিত করতে পারবে না।
চরিত্রের হেফাজতকারী সম্পর্কে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাকে তার দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী অঙ্গ (জিহ্বা) এবং দুই পায়ের মধ্যবর্তী অঙ্গ (লজ্জাস্থান)-এর হেফাজতের নিশ্চয়তা দেবে, আমি তার জন্য জান্নাতের নিশ্চয়তা দিচ্ছি’ (সহিহ বুখারি)।
চারিত্রিক সব ধরনের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার প্রথম শর্ত হলো চোখের হেফাজত। চোখ একটি দেশের সীমান্তের মতো। সীমান্ত যদি অরক্ষিত থাকে, তবে রাজধানী অর্থাৎ হৃদয়কে নিরাপদ রাখা অসম্ভব। তাই আল্লাহতায়ালা মুমিন পুরুষদের নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে’ (সুরা আন-নূর)।
বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ উপাদান আমাদের দৃষ্টিকে প্রতিনিয়ত কলুষিত করছে। মানুষ যখন একবার নিষিদ্ধ কোনো দৃশ্যের দিকে দৃষ্টি দেয়, তখন তার বিষ অন্তরে প্রবেশ করতে শুরু করে। চুলকানি হলে যেমন চুলকাতে সাময়িক আরাম লাগে, কিন্তু পরে সেই স্থানেই অসহ্য জ্বালাপোড়া শুরু হয়। পাপের অবস্থাও ঠিক তেমনই। এতে ক্ষণিকের বিকৃত আনন্দ থাকতে পারে, কিন্তু তার পরিণতি হলো ভয়াবহ।
আল্লাহর শাস্তির ভয় তো আছেই; এর পাশাপাশি মনে রাখতে হবে, চরিত্রই মানুষের ব্যক্তিত্বের মুকুট। মাথার মুকুট যেমন সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তেমনি মানুষের চরিত্রও সবার আগে মানুষের চোখে পড়ে। তাই চরিত্রের হেফাজত মানে শুধু একটি গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা নয়; নিজের ইমান, ব্যক্তিত্ব, সম্মান ও আখেরাতকে রক্ষা করা। আসুন ফিতনার এই যুগে আমরা চরিত্রের হেফাজতে সর্বদা সচেষ্ট থাকি। কারণ চরিত্র মানুষের ব্যক্তিত্বের মুকুটতুল্য। এই মুকুট অক্ষুণ্ন রাখতে পারলেই মানুষ দুনিয়ায় সম্মানীয় জীবন লাভ করে, আর আখেরাতে লাভ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতের চিরস্থায়ী সফলতা।
♦ জুমার মিম্বর থেকে
গ্রন্থনা : তানিম রৌশন
বিডি প্রতিদিন
Leave a Reply