1. admin@dailybdfreepress.com : admin :
August 1, 2026, 4:17 pm

নিজেকে চেনা ও আত্মসংশোধনের উপায়

  • Update Time : শনিবার, আগস্ট ১, ২০২৬
  • 1 Time View

নিজেকে চেনা ও আত্মসংশোধনের উপায়

 

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ

 

ইমাম ইবনু কুদামা আল-মাকদিসি (রহ.) তাঁর ‘মুখতাসার মিনহাজুল কাসিদিন’ গ্রন্থে লিখেছেন, যে ব্যক্তি নিজের দোষত্রুটি জানতে চায়, তার জন্য চারটি উপায় আছে-

১. একজন প্রজ্ঞাবান ও অভিজ্ঞ শাইখের কাছে বসা। এমন একজন আলেম বা মুরব্বির কাছে থাকা, যিনি আত্মার রোগ ও ত্রুটি সম্পর্কে অভিজ্ঞ।

তিনি তার দোষগুলো চিনিয়ে দেবেন এবং সেগুলোর চিকিৎসার পথ দেখাবেন। বর্তমান যুগে এমন মানুষ খুবই বিরল। তাই যে ব্যক্তি এমন একজন শিক্ষক পেয়ে যায়, সে যেন একজন দক্ষ চিকিৎসক পেয়ে গেল। তার উচিত হবে তাকে ছেড়ে না যাওয়া।

২. একজন সত্যবাদী ও দ্বিনদার বন্ধুকে নিজের সমালোচক বানানো। এমন একজন আন্তরিক, বিচক্ষণ ও ধার্মিক বন্ধুকে নির্বাচন করবে, যিনি নিজের ভুলত্রুটি সততার সঙ্গে জানিয়ে দেবেন।

৩. শত্রুর কথার মাধ্যমেও নিজের দোষ জানা। অনেক সময় শত্রু এমন কিছু ত্রুটি প্রকাশ করে, যা বন্ধু লুকিয়ে রাখে।

৪. মানুষের সঙ্গে মিশে শিক্ষা গ্রহণ করা। মানুষের মধ্যে যে আচরণগুলো নিন্দনীয় বা খারাপ বলে মনে হয়, সেগুলো নিজের মধ্যে না আসতে দেওয়া। অন্যের ভুল দেখে শিক্ষা নেওয়াও আত্মসংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

আত্মসংস্কারের চারটি ধাপ

১. অন্তরের সংশোধন : সর্বপ্রথম হৃদয়কে শুদ্ধ করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জেনে রাখো, শরীরে একটি মাংসপিণ্ড আছে। তা যদি ভালো হয়, তবে সমগ্র শরীর ভালো হয়; আর তা যদি নষ্ট হয়, তবে সমগ্র শরীর নষ্ট হয়। জেনে রাখো, সেটি হলো হৃদয়।’ (সহিহ বুখারি)

২. চরিত্র ও আচরণের সংশোধন : শুধু হৃদয় ভালো হলেই যথেষ্ট নয়, আচরণও সুন্দর হতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সামনে দাঁড়ানোর ভয় করে এবং নিজের প্রবৃত্তিকে কুপ্রবৃত্তি থেকে বিরত রাখে, তবে জান্নাতই হবে তার আশ্রয়।’ (সুরা : আন-নাজিআত, আয়াত : ৪০-৪১)

৩. অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে নেক কাজে অভ্যস্ত করা : হৃদয় ও চরিত্রের প্রভাব মানুষের কাজের মধ্যে প্রকাশ পায়। তাই চোখ, কান, জিহ্বা, হাত-পাকে এমনভাবে প্রশিক্ষিত করতে হবে, যেন সেগুলো আল্লাহর আনুগত্যেই ব্যবহৃত হয়।

৪. সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা : মুসলিম শুধু খাওয়া, ঘুমানো ও মৃত্যুর জন্য বেঁচে থাকে না। সে পৃথিবীতে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কল্যাণকর ভূমিকা পালন করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা সৎ কাজ করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৭৭)

অন্যের দোষ নিয়ে ব্যস্ত না হয়ে নিজের সংশোধনে মনোযোগ দেওয়া উচিত। অন্যের বিষয় নিয়ে শুধু ততটুকুই ব্যস্ত হন, যতটুকু আল্লাহ আপনার ওপর দায়িত্ব দিয়েছেন। ড. মুস্তাফা আস-সিবাঈ (রহ) তাঁর ‘এভাবেই জীবন আমাকে শিক্ষা দিয়েছে’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘যখন তোমার নফস কোনো গুনাহের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন তাকে প্রথমে আল্লাহর কথা স্মরণ করাও। যদি সে ফিরে আসে, তবে আল্লাহর প্রশংসা করো। যদি না ফিরে আসে, তবে তাকে সম্মানিত মানুষের চরিত্রের কথা স্মরণ করাও। যদি তাতেও না ফিরে আসে, তবে মানুষের সামনে লাঞ্ছিত হওয়ার কথা স্মরণ করাও। যদি তাতেও না ফিরে আসে, তবে জেনে রাখো-সে নফস এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তা পশুসুলভ প্রবৃত্তির অনুসারী হয়ে গেছে।’

এ কথার উদ্দেশ্য মানুষকে অপমান করা নয়; বরং বোঝানো যে যখন মানুষ বিবেক, ঈমান, উত্তম চরিত্র এবং সামাজিক লজ্জাবোধ-সব ধরনের নৈতিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে, তখন সে শুধু প্রবৃত্তির অনুসরণে চলতে শুরু করে। ইসলাম মানুষকে এ অবস্থা থেকে বাঁচিয়ে আত্মসংযম, তাকওয়া ও নৈতিক উন্নতির দিকে আহবান জানায়। স্মরণ রাখুন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই নফস (মানুষের প্রবৃত্তি) মন্দ কাজেরই নির্দেশ দেয়।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৫৩)

যদি আপনার নফস আল্লাহর আনুগত্য থেকে বিরত রাখতে চায়, তবে তাকে পাপ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করুন। নিজের নফসের চেয়ে নিয়ন্ত্রণ করার মতো আর কিছু নেই। জিহ্বা ও দৃষ্টির চেয়ে সংযমে রাখার মতো আর কোনো অঙ্গও নেই। এগুলোকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, যাতে তারা আল্লাহর অসন্তুষ্টির পথে না যায়। স্মরণ রাখুন, আপনি কি আল্লাহর অবাধ্য হয়ে তাঁর রহমতের আশা করতে পারেন? আল্লাহর নাফরমানি করে তাঁর জান্নাতের আশা করা উচিত নয়।

মনে রাখুন, এক দিন অবশ্যই আপনাকে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হবে। যেমন কর্ম করবেন, তেমনি প্রতিফল পাবেন। প্রতিদান কর্মেরই অনুরূপ হয়। আর মহান আল্লাহ কারো প্রতি সামান্যও অবিচার করেন না।

মনে রাখুন, কত সাময়িক কামনা-বাসনা মানুষের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী অপমানের কারণ হয়েছে! কত গুনাহ এমন হয়েছে, যার কারণে একজন মানুষ বছরের পর বছর তাহাজ্জুদের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে! কত নিষিদ্ধ দৃষ্টি এমন হয়েছে, যা মানুষের অন্তর্দৃষ্টির (বাসিরাহ) নুর কেড়ে নিয়েছে!

গুনাহের সবচেয়ে বড় শাস্তি

গুনাহের সবচেয়ে ভয়াবহ শাস্তি হলো ইবাদতের মাধুর্য থেকে বঞ্চিত হওয়া। অনেক সময় মানুষ তা অনুভবই করে না। এর কারণ হতে পারে-অন্তর্দৃষ্টির দুর্বলতা, ঈমানের দুর্বলতা অথবা হৃদয়ের কঠোরতা।

ইমাম ইবনুল জাওজি (রহ) একটি হৃদয়স্পর্শী ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, বনি ইসরাঈলের এক জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছিলেন, ‘হে আমার রব! আমি কতবার আপনার অবাধ্য হই, অথচ আপনি আমাকে শাস্তি দেন না!’ তখন তাকে বলা হলো, ‘আমি তো তোমাকে বহুবার শাস্তি দিয়েছি, কিন্তু তুমি তা বুঝতে পারনি। আমি কি তোমাকে আমার সঙ্গে একান্ত কথোপকথনের (মোনাজাতের) মাধুর্য থেকে বঞ্চিত করিনি?’ (সাইদুল খাতির, পৃষ্ঠা-৬৫)

পরিশেষে আত্মশুদ্ধি এক দিনের কাজ নয়; এটি সারা জীবনের সাধনা। যে ব্যক্তি নিজের দোষ চিনতে শেখে, আন্তরিকভাবে তাওবা করে, হৃদয় ও চরিত্রকে সুন্দর করে এবং সমাজে কল্যাণের জন্য কাজ করে, সে-ই প্রকৃত অর্থে আত্মসংস্কারের পথে অগ্রসর হয়।

ইসলামের শিক্ষা হলো, অন্যের ত্রুটি অনুসন্ধানের আগে নিজের হৃদয়, চরিত্র ও কর্ম সংশোধন করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা।

বিডি প্রতিদিন

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

© All rights reserved © 2019 Effective News
Theme Customized By Positiveit.us