সত্য প্রতিষ্ঠায় ন্যায় ও শিষ্টাচারের গুরুত্ব
মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
ইসলাম কখনো অন্যায়ের সামনে নীরব থাকতে শেখায় না; বরং একজন মুমিনকে সত্যের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে, জুলুমের প্রতিবাদ করতে এবং মানুষকে সৎ কাজের আহবান জানাতে উদ্বুদ্ধ করে। এই কাজগুলো করতে হবে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় পরিপূর্ণ ইখলাসের সঙ্গে।
সত্যের পক্ষে থাকার নামে কোনো অবস্থায়ই সীমা লঙ্ঘন করা যাবে না। সত্য প্রতিষ্ঠার নামে কাউকে অন্যায়ভাবে আঘাত করা, মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, অহেতুক ব্যক্তিগত আক্রমণ করা বা অশ্লীলতার চর্চা করা ইসলামের শিক্ষা নয়।
অনেকেই মনে করেন, ‘আমি সত্য বলি, তাই যা ইচ্ছা বলতে পারি।’ অথচ কোরআন এই ধারণাকে সমর্থন করে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সঙ্গে সাক্ষ্যদানকারী হিসেবে সদা দণ্ডায়মান হও। কোনো কওমের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদের কোনোভাবে প্ররোচিত না করে যে তোমরা ইনসাফ করবে না। তোমরা ইনসাফ করো, তা তাকওয়ার নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই তোমরা যা করো, আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৮)
এই আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, সত্য অবশ্যই বলতে হবে; কিন্তু কারো প্রতি শত্রুতার বশবর্তী হয়ে তার ওপর বেইনসাফ করা যাবে না। সীমা লঙ্ঘন করা যাবে না।
কাউকে সংশোধন করার ক্ষেত্রেও মুমিনের ভাষা হতে হবে কল্যাণকামিতার ভাষা। আল্লাহ মুসা (আ.) ও হারুন (আ.)-কে ইতিহাসের সবচেয়ে উদ্ধত শাসক ফেরাউনের কাছে পাঠিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমরা তার সঙ্গে নরম কথা বলবে। হয়তো বা সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।’ (সুরা : ত্ব-হা, আয়াত : ৪৪)
এখানে একটা বিষয় লক্ষণীয়, ফেরাউন ছিল ইতিহাসের অন্যতম অহংকারী নিকৃষ্ট মানুষ। তার মতো কুখ্যাত ব্যক্তি পৃথিবীতে খুব কম জন্ম নিয়েছে; কিন্তু মহান আল্লাহ তার সামনে সত্য বলার জন্য যখন তাঁর নবীকে আদেশ করেছেন, তখন শিষ্টাচার বজায় রেখে কথা বলার নির্দেশ দিয়েছেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনও একই শিক্ষা দেয়। মক্কার কাফিররা তাঁকে অপমান করেছে, নির্যাতন করেছে, মিথ্যাবাদী ও জাদুকর বলেছে; কিন্তু তিনি কখনো তাদের ঘায়েল করার জন্য তাদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ আনেননি, অসত্য প্রচার করেননি বা অথবা সত্য কথাগুলোও কুরুচিপূর্ণ ভাষায় বলেননি; বরং আল্লাহ তাঁকে নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তুমি তোমার রবের পথে হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে আহবান করো এবং সুন্দরতম পন্থায় তাদের সঙ্গে বিতর্ক করো। নিশ্চয়ই একমাত্র তোমার রবই জানেন কে তাঁর পথ থেকে ভ্রষ্ট হয়েছে এবং হেদায়েতপ্রাপ্তদের তিনি খুব ভালো করেই জানেন।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ১২৫)
মুমিনকে সত্যের পথে লড়াই করতে গিয়ে কখনো কখনো প্রতিপক্ষের সঙ্গে বিতর্ক করতে হবে; কিন্তু সেখানেও তাদেরকে তাদের শিষ্টাচার বজায় রাখতে হবে। (বাস্তবে জিহাদ ফরজ হওয়ার মতো কোনো বিষয় না হলে) কোনো রকম আঘাত করা তো দূরের কথা, সর্বোত্তম ও ন্যায়সংগত আচরণ করতে হবে। অনুমাননির্ভর কথা দিয়ে কাউকে আঘাত করা যাবে না। এ ব্যাপারে সতর্ক করে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা অধিক অনুমান থেকে দূরে থাকো। নিশ্চয়ই কোনো কোনো অনুমান তো পাপ। আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান কোরো না এবং একে অপরের গিবত কোরো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা অপছন্দই করে থাকো। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ অধিক তাওবা কবুলকারী, অসীম দয়ালু।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১২)
সত্যের পক্ষে লড়াই করতে গিয়ে এমন অনৈসলামিক কোনো পন্থা অবলম্বন করা যাবে না, যা সত্যের সৈনিককে জালিমের কাতারে দাঁড় করিয়ে দেয়।
সত্য বলার সাহস অবশ্যই মুমিনের অলংকার; কিন্তু সেই সাহস যদি শিষ্টাচার, ইনসাফ ও কল্যাণকামিতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবে তা মানুষকে সত্যের কাছাকাছি নয়, কখনো কখনো সত্য থেকেই দূরে ঠেলে দিতে পারে। তাই মুমিনের উচিত সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহকে হাজির-নাজির রেখে সব কাজ করা।
বিডি প্রতিদিন
Leave a Reply