ইসলামে মানুষের সম্মানহানি নিষিদ্ধ
মো. আবদুল মজিদ মোল্লা
ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন মুসলমানের যেমন অন্যের জীবন ও সম্পদের ক্ষতি করা নিষিদ্ধ, তেমনি তার সম্মান ও সামাজিক মর্যাদায় আঘাত করাও নিষিদ্ধ।
ইসলাম এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, যেখানে মানুষ পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে এবং কারো ব্যক্তিগত দুর্বলতা, ভুল বা গোপন বিষয়কে কেন্দ্র করে তাকে অপমানিত বা হেয় করবে না। গিবত, অপবাদ, কুৎসা, উপহাস, দোষ অনুসন্ধান ও প্রকাশ্যে অপমান—এসব কাজ শরিয়তে নিষিদ্ধ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! কোনো পুরুষ যেন অন্য পুরুষকে উপহাস না করে; হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম। আর কোনো নারী যেন অন্য নারীকে উপহাস না করে; হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১১)
আল্লাহ তাআলা আরো বলেছেন, ‘তোমরা একে অপরকে দোষারোপ কোরো না এবং একে অপরকে মন্দ উপাধিতে ডেকো না।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১১)
অর্থাৎ কারো চেহারা, বংশ, দারিদ্র্য, শারীরিক বৈশিষ্ট্য, পেশা, ভুল বা সামাজিক অবস্থাকে কেন্দ্র করে তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা ইসলামে নিষিদ্ধ।
অন্যের সম্মানহানির সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ও প্রধান মাধ্যম হলো গিবত তথা অগোচরে মানুষের দোষ চর্চা করা। আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত কঠোর ভাষায় গিবত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা একে অপরের গিবত কোরো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা ঘৃণা করো। আর আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।’
(সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১২)
কারো সম্পর্কে মিথ্যা অভিযোগ বা অপমানজনক তথ্য ছড়ানো ইসলামে অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। বিশেষত কারো চরিত্র বা সতীত্ব নিয়ে অপবাদ দেওয়া ভয়াবহ গুনাহ। আল্লাহ বলেন, ‘যারা সতী, সরলমনা ও মুমিন নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত এবং তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।’
(সুরা : নুর, আয়াত : ২৩)
এ থেকে বোঝা যায়, কারো চরিত্র ও সম্মান নিয়ে ভিত্তিহীন অভিযোগ করা কঠিন গুনাহর কাজ। এমনই আরেকটি গুনাহর কাজ হলো মানুষের গোপন দুর্বলতা অনুসন্ধান করে তা প্রকাশ করা। আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান কোরো না এবং একে অপরের গিবত কোরো না।’
(সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১২)
বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কারো ব্যক্তিগত ছবি, বক্তব্য, ভুল বা পারিবারিক বিষয় অনুমতি ছাড়া ছড়িয়ে দেওয়াও দোষ অনুসন্ধান, দোষচর্চা ও সম্মানহানির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। মনে রাখতে হবে, কোনো তথ্য সত্য হলেই তা প্রকাশ করা বৈধ হয়ে যায় না; প্রকাশের প্রয়োজন, উদ্দেশ্য ও সম্ভাব্য ক্ষতিও বিবেচনা করতে হয়।
হাদিসের আলোকে একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো, মুমিনের দোষ গোপন করা এবং তার সম্মান রক্ষা করা। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এক মুসলমানের জন্য অন্য মুসলমানের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান—সবই হারাম। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৮২)
ইসলাম শুধু সম্মানহানি করতে নিষেধ করেনি, বরং মানুষের সম্মান রক্ষার উপায়ও বলে দিয়েছে এবং মুসলিম সমাজে সেই সংস্কৃতি গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছে। আধুনিক যুগে এর প্রধান উপায় হলো কোনো সংবাদ জানার পর তা যাচাই করে নেওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! কোনো ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে এলে তা যাচাই করে নাও।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ৬)
সুতরাং কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনেই তা প্রচার করা যাবে না। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির সম্মানহানিকর তথ্য শেয়ার করার আগে তার সত্যতা, প্রয়োজনীয়তা ও পরিণতি বিবেচনা করা জরুরি। কেননা মহানবী (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন, মুসলিম সে-ই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে মুসলমানরা নিরাপদ থাকে।
(সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪০)
আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক জ্ঞান দান করুন। আমিন।
বিডি প্রতিদিন
Leave a Reply