বিশেষ লেখা
সাদামনের আদর্শবান শিক্ষক যখন জাতির অভিভাবক
অনলাইন ডেস্ক
একজন আপাদমস্তক ভালো মানুষ। শিক্ষিত, মার্জিত। ৭৮ বছরের জীবনে বিতর্ক তাঁকে স্পর্শ করেনি। আদর্শে হিমালয়ের মতো অটল কিন্তু কথাবার্তায় বিনয়ী, মিষ্টভাষী। অসম্ভব ত্যাগী, কিন্তু তার চেয়েও বেশি বিনয়ী। রাজনীতিতে যখন নোংরামি আর কুরুচিপূর্ণ ভাষার মহামারি তখন তিনি এক অসাধারণ ব্যতিক্রম। বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন পরিচ্ছন্ন মানুষ। দীর্ঘ জীবনে কলঙ্ক যাকে কখনো স্পর্শ করেনি। বিএনপি রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে সঠিক মানুষটিকে বেছে নিয়েছে। এটা প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং সুস্থ ধারার রাজনীতির প্রতি আস্থার প্রতীক। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন দিয়ে বিএনপি শুধু সারা জীবন আদর্শ লালন করা একজন অনুকরণীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে সম্মানিত করেনি, রাষ্ট্রপতি পদকেই মর্যাদা দিয়েছে। এটা সৎ, নিষ্ঠাবান এবং নিবেদিতপ্রাণ একজন রাজনীতিবিদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। সুস্থ ধারার রাজনীতির বিজয়। আমরা কেমন রাজনীতিবিদ চাই? এ প্রশ্নের উত্তরে চাহিদার ফর্দটাঅনেক দীর্ঘ হবে। একজন রাজনীতিবিদকে অবশ্যই আদর্শবান হতে হবে। দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন থেকে দূরে থাকতে হবে। হতে হবে জনবান্ধব, কর্মীদের আস্থাভাজন। আমরা এমন রাজনীতিবিদ চাই যারা কঠিন সময়ে ভেঙে পড়বেন না বরং পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকবেন। দুঃসময়ে মানুষের পাশে থেকে তাদের ঐক্যবদ্ধ করবেন। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এসব বৈশিষ্ট্যে একজন রাজনীতিবিদ পাওয়া সোনার পাথরবাটি পাওয়ার মতোই। কিন্তু আমাদের সৌভাগ্য যে, এরকম বৈশিষ্ট্যের কথা বললেই আমাদের সামনে ভেসে ওঠে যার নাম তিনিই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কোন পরিচয়ে পরিচিত হবেন মির্জা ফখরুল? একজন সৎ এবং ভালো মানুষ। একজন মেধাবী এবং ভালো শিক্ষক। একজন আদর্শবান, ত?্যাগী রাজনীতিবিদ। দুঃসময়ের কান্ডারি- এসব মিলেই অসাধারণ একজন মানুষ তিনি। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর চেয়ে ভালো কোনো প্রার্থী ছিল বলে মনে হয় না। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্স ও মাস্টার্স করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই ছাত্ররাজনীতিতে নাম লেখান। এরপর ধীরে ধীরে সক্রিয় হতে থাকেন ছাত্ররাজনীতিতে। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের একজন সদস্য ছিলেন ও সংগঠনটির এস এম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৬৯-এর গণ অভ্যুত্থানের সময় তিনি সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ছিলেন। ছাত্রজীবনের সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হলেও কর্মজীবনের শুরুতে তিনি শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন ও একাধিক সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। ১৯৭২ সালে অধ্যাপনাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা করেন তিনি। এরপর পৌরসভা নির্বাচন সামনে রেখে শিক্ষকতা পেশা থেকে অব্যাহতি নিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। সফল নির্বাচনি প্রচারণা চালিয়ে ১৯৮৮ সালের পৌরসভা নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। এরশাদের সামরিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলন চলাকালীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দেন মির্জা ফখরুল। এরপর ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে মনোনীত হন তিনি। মির্জা ফখরুল তৃণমূল থেকে উঠে আসা একজন পরীক্ষিত নেতা।
লক্ষ?্যণীয় বিষয় হলো, তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন এমন একসময়ে যখন দলটি দুঃসময়ে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপি এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে। সামরিক শাসন জারি করে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বিএনপি ধ্বংসের খেলায় মেতে ওঠেন। দলের অনেক শীর্ষ নেতা এরশাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দলত্যাগ করেন। এরশাদ বিএনপির বহু নেতাকে গ্রেপ্তার করেন। দল বাঁচাতে, দেশ বাঁচাতে এগিয়ে আসেন বেগম খালেদা জিয়া। স্বৈরাচার মুক্ত করতে আন্দোলনের ডাক দেন তিনি। গণতন্ত্রের জন্য শুরু হয় এক কঠিন লড়াই। বেগম জিয়ার ডাকে সাড়া দিয়ে বিএনপিতে যোগ দেন মির্জা ফখরুল। আমাদের দেশের রাজনীতিতে আমরা দেখি যে, একটি দল যখন ক্ষমতায় থাকে তখনই সেই দলে যোগদানের হিড়িক পড়ে যায়। একটি দলের সুসময়ে মৌমাছির অভাব হয় না। কিন্তু দুঃসময়ে কর্মীদেরও খুঁজে পাওয়া যায় না। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন দুঃসময়ে। যোগদানের পর দলের সব সংকটে তিনি ছিলেন পাশে। ২০০৭-এ এক-এগারোর সময় থেকে ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন পর্যন্ত বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে কঠিনতম সময়ে তিনি ছিলেন অকুতোভয় যোদ্ধা। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব পদে নির্বাচিত হন। এ পদটিতে এর আগে বিএনপি চেয়ারম্যান এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব পালন করেন। ২০১১ সালের ২০ মার্চ বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন মৃত্যুবরণ করার পর দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ঘোষণা করেন। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ দলটির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে মির্জা ফখরুল মহাসচিব হিসেবে নির্বাচিত হন। এ সময়ে বিএনপির ওপর চলে নির্মম অত্যাচার ও নির্যাতন। লাখো নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন বহু নেতা-কর্মী। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা করা হয়। বারবার মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয় এই নির্ভীক নেতাকে। কিন্তু জুলুম নির্যাতনেও তাঁর মনোবল ভেঙে ফেলতে পারেনি তৎকালীন সরকার। বিএনপি ভাঙার সব ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে এবং নির্দেশনায় দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার কাজ করে যান নিরলসভাবে। শুধু দলের ঐক্য নয়, বিএনপিকে আরও সংগঠিত এবং শক্তিশালী করেন এই দূরদর্শী নেতা। তিনি স্বৈরাচারবিরোধী রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলেন তারেক রহমানের নেতৃত্বে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিএনপি যে নিপীড়নের আগুনে পুড়ে আরও শক্তিশালী এবং দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে তার পেছনে রয়েছে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সুযোগ্য নেতৃত্ব এবং ত্যাগ।
নীতির প্রশ্নে অনড়, আপসহীন হলেও মির্জা ফখরুল ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। ভিন্ন চিন্তার রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের প্রতি কখনোই বাজে কিংবা অশালীন মন্তব্য করেননি তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনে। এ কারণেই দলমত-নির্বিশেষে সবার কাছেই একজন নিপাট ভদ্রলোক হিসেবে পরিচিত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
আমাদের সমাজে অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। কিশোর তরুণদের সামনে আইডল নেই। কিন্তু এই অস্থির সময়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একজন অনুসরণীয় রাজনীতিবিদ। তাঁর চরম রাজনৈতিক প্রতিপক্ষও তাঁকে একজন সজ্জন মানুষ হিসেবে মনে করে।
এরকম একজন ব্যক্তি দেশের রাষ্ট্রপতি হবেন। এটা নিশ্চয়ই অনেক বড় স্বস্তির খবর। তিনি রাষ্ট্রপতি হলে জাতি একজন সত্যিকারের অভিভাবক পাবে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুলের মতো একজন সত্যিকারের সাদা মনের মানুষকে মনোনয়ন দেওয়ায় বিএনপি একটা বড় ধন্যবাদ অবশ্যই পেতে পারে।
বিডি প্রতিদিন
Leave a Reply